গরমে নবজাতকের যত্ন নিতে কি কি করতে হবে আপনাকে?

গরমে নবজাতকের যত্ন

জন্মের পর থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত বয়সী শিশুকে নবজাতক বলা হয়। এ সময় মা ও শিশু দুজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ৷ নবজাতককে নিরাপদ রাখতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই।

নানান ভাবে এই গরমে নবজাতকের যত্ন নিতে পারেন

#১.শরীর যেন আর্দ্র থাকে (Keep the baby hydrated)

গরমে আমাদের যেমন ঘন ঘন জল তেষ্টা পায়, শিশুরও কিন্তু গলা শুকিয়ে যায়। যেহেতু, সদ্যোজাত শিশু মায়ের দুধই খায়, তাই ওকে কিছুক্ষণ পরপর একটু করে দুধ খাইয়ে দিন। যদি কোনও কারণবশত আপনি ওকে ব্রেস্ট মিল্ক দিতে পারছেন না এবং ফর্মুলা খাওয়াতে শুরু করেছেন, তা হলে বাচ্চাকে ফর্মুলার সাথেই জল দিতে হবে। কিন্তু, অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে। বাচ্চাকে জল খাওয়াতে হলে সেই জল যেন অতিমাত্রায় বিশুদ্ধ হয় এবং জলের বোতল যেন অবশ্যই স্টেরিলাইজড করা হয়। শিশুকে জল দেওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া একান্ত জরুরি। বাচ্চা ব্রেস্ট মিল্ক খেলে লক্ষ্য রাখতে হবে আপনার খাওয়া-দাওয়ার ওপর। বেশি করে জল খান আপনিও। দিনে অন্তত ৩ লিটার তো বটেই।

#2. স্নান করার শিশুকে (Bathe your baby regularly)

গরমে নবজাতকের যত্ন এর জন্য প্রচণ্ড গরমে বাচ্চাকে স্নান করানো অবশ্যই উচিত। তবে, মনে রাখবেন, বাচ্চার স্নানের জল যেন কখনই খুব গরম বা খুব ঠান্ডা না হয়। কুসুম গরম জলে বাচ্চাকে স্নান করান। হাতের কনুই জলে ডুবিয়ে জলের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে নিন। বাচ্চাকে স্নান করালে বাচ্চার দেহের তাপমাত্রাও কমে এবং ও আরাম পায়। এমনকি, ডাক্তার যদি অনুমতি দেন, তা হলে আপনার ছোট্ট শিশুটিকে আপনি দিনে এক বারের বেশিও স্নান করাতে পারেন। স্নানের সময় বগল ও গোপনাঙ্গের খাঁজ পরিষ্কার করে দিন। এইসব স্থানে ঘাম বেশি হয় বলে নোংরা বেশি বসে ইনফেকশন হতে পারে।

#3. তেল মালিশের খুঁটিনাটি (Oil massage is must)

গরম কাল বলে ভাববেন না, যে শিশুকে তেল মাখানো যাবে না। আমরা না হয় বড়, গরম কালে তেল মাখার নাম শুনলে আঁতকে উঠি। কিন্তু, শিশুর ক্ষেত্রে একেবারেই এই ধারণা কাজ করে না। বাচ্চাকে ভালো কোম্পানির বেবি অয়েল দিয়ে ম্যাসাজ করে দিন। লক্ষ্য রাখবেন, বাচ্চাকে যে বেবি অয়েল মাখাচ্ছেন সেটা ওর স্যুট করছে কি না। যেহেতু, বাচ্চা একেবারেই ছোট, তাই যে কোনও নতুন কিছু শুরুর আগে একটু বিশেষ লক্ষ্য রাখতেই হবে। ভালো গুণমানের বেবি অয়েল শিশুকে মাখালে শিশুর শরীর ঠান্ডা হয়, ত্বক নরম থাকে এবং ওর ঘুমও ভালো হয়।

তবে, যেহেতু গরম কাল, তাই শিশুকে তেল মালিশ করে দেওয়ার পর ভালো করে ভিজে কাপড় দিয়ে সব তেলটা মুছে দিন বা স্নান করিয়ে দিন। শিশুর গায়ে যেন অতিরিক্ত তেল লেগে না থাকে বা তেল প্যাচপ্যাচে ভাব না থাকে। গরম কালে সরষের তেল মাখাবেন না কারণ; এই তেল শরীর গরম করে। গরমে সরষের তেল মাখালে শিশুর র‍্যাশ, ফুসকুড়ি বা ঘামাচি হতেই পারে। বেবি অয়েল ছাড়া নারকেল তেল, তিল তেল বা অলিভ অয়েল শিশুর মালিশের জন্য খুব ভালো।এই তেলগুলি মাখালেও শিশুর শরীর ঠান্ডা হয়।

আর পড়ুনঃ বর্ষায় শিশুর যত্ন

#4. বেবি পাউডার সঙ্গে থাকুক (Start using baby powder)

ভালো কোম্পানির বেবি পাউডার শিশুটিকে অনেক আরাম দিতে পারে। গরমে ঘাম থেকে হওয়া র‍্যাশ বা বিছানার সাথে ঘষা লেগে শিশুর পিঠে যে র‍্যাশ হয়, তার থেকে রক্ষা করতে পারে এই বেবি পাউডার। বেবি পাউডারে কুলিং এজেন্ট থাকায় বাচ্চার শরীর ঠান্ডাও রাখে। তবে, কোনও কিছুই তো অতিরিক্ত ভালো নয়। এই একই কথা পাউডারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বেশি পাউডারে লোমকূপ বন্ধ হয়ে র‍্যাশ গজাতে পারে। বাচ্চার গায়ে সরাসরি পাউডার ঢালবেন না। নিজের হাতে পাউডার ঢেলে হাতে মেখে নিন, তারপর বাচ্চার গায়ে আপনার হাতে করে পাউডার মাখিয়ে দিন। এর ফলে, বাচ্চাকে অতিরিক্ত পাউডার মাখানোও হয় না, আবার বাচ্চার নাকে পাউডার ঢুকে যায় না।

#5. ঢিলেঢালা জামা-কাপড় (Choose right clothes)

গরমে নবজাতকের যত্ন নিতে বাচ্চাটিকে এমন জামা-কাপড় পরান, যেন তাতে যথেষ্ট হাওয়া বাতাস খেলে। বাচ্চার গায়ে ঘাম হলে কিছু সময় পরপর ওর জামা পাল্টে দিন। দুপুরের চড়া রোদে ছোট্ট বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে না বেরোলেই ভালো। সারাদিন ডায়াপার পরিয়ে রাখবেন না। প্রয়োজনে শুধুমাত্র রাতেই ডায়াপার পরান।

#6. ঘরের তাপমাত্রায় বেশি পরিবর্তন আনবেন না (Don’t change the room temperature frequently)

জন্মের পর বাচ্চারা পরিবেশের তাপমাত্রার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করে। তাই বাচ্চা যেখানে থাকে, সেই ঘরের তাপমাত্রার হঠাৎ হঠাৎ রদবদল তার ছোট্ট শরীর ঠিক ভাবে মানিয়ে নিতে পারে না। বাচ্চা যে ঘরে থাকবে, সেখানে ফ্যানের স্পিড বা এয়ারকন্ডিশনের তাপমাত্রা একই রকম রাখুন। বাচ্চার ঘরের আদর্শ তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি হওয়া উচিত। এয়ার কুলার ব্যবহার করলে তা যেন নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। How to take care of a Newborn in Summer in Bangla.

গরমে নবজাতকের যত্ন ও সুস্থ রাখতে আরো কিছু উপায়

১। স্বাস্থ্যকর ও বিশুদ্ধ খাবার

শিশুর সঠিক খাদ্যাভাসই গরমের সমস্যা থেকে শিশুকে অর্ধেক সুরক্ষা দিতে পারে।

  • আপনার সন্তান যদি শুধু বুকের দুধের উপর নির্ভরশীল থাকে তাহলে তাকে অল্প অল্প করে কিন্তু ঘনঘন বুকের দুধ খাওয়ান। কারণ গরমে ঘামানোর কারণে শরীরে পানি স্বল্পতা দেখা দিতে পারে। ঘনঘন বুকের দুধ খাওয়ালে এই সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
  • আপনার সন্তান যদি বাড়তি খাবার খাওয়া শুরু করে তাহলে তাকে বাড়তি খাবারের পাশাপাশি হালকা বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। অথবা বুকের দুধ না খাওয়ালে খাবারের পাশাপাশি হালকা কুসুম গরম দুধ অথবা ফর্মুলা খাওয়াতে পারেন।
  • গরমে গরুর দুধ ও তরল দুধ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় সেজন্য পাউডার দুধ রাখতে পারেন। তবে পাউডার দুধ ও ফরমুলা মিল্ক অবশ্যই সুরক্ষিত থাকে এমন কোন জার অথবা জায়গার রাখুন।
  • কোন কারণে বাসার বাইরে গেলে ফলমূল ও শুকনো খাবার সাথে রাখুন। রান্না করা খাবার বা তরল খাবার গরমে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

২। নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানি

গরমে সুস্থ থাকার জন্য বিশুদ্ধ পানি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ

  • শিশুর জন্য অবশ্যই ফুটানো অথবা ফিল্টারিং করা পানি ব্যবহার করবেন।
  • মিনারেল ওয়াটার খাওয়ানোর সময় বোতলের গায়ের মেয়াদ ও বোতলের মুখ অব্যবহৃত কিনা তা দেখে নিতে হবে।
  • ডিহাইড্রেশন থেকে সুরক্ষার জন্য ১ বছরের কম বয়সি শিশুর ৮-১২ আউন্স (২২৬ গ্রাম থেকে ৩৪০ গ্রাম) পানি পান করা উচিত। ১ বছরের বেশি বয়সিদের জন্য অন্তত ৩০ আউন্স (৮৫০ গ্রাম) পানি পান করা উচিত।
  • অতিরিক্ত গরমে শিশুর ডিহাইড্রেশনের দিকে নজর রাখুন। ডিহাইড্রেশনের লক্ষন দেখলে পানির পরিমাণ বাড়ান অথবা ডাক্তারের পরামর্শ নিন। (ডিহাইড্রেশনে লক্ষন-৬ ঘন্টার বেশি প্রস্রাব, পায়খানা না করা; কাঁদলে চোখ দিয়ে পানি বের না হওয়া, অতিরিক্ত ঘুম ও নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, ঠোট শুকিয়ে যাওয়া ও ফ্যাকাশে দেখানো)

৩। সঠিক পোশাক পরিধান

গরমে শিশুকে সঠিক পোশাক পরিধান করানোও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এতে অনেকাংশেই গরম থেকে বাঁচা যায়।

  • শিশুকে অতিরিক্ত জামা কাপড় পরাবেন না।
  • সুতি, পাতলা ও ঢিলেঢালা জামা পছন্দ করুন। বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে জামার রঙয়ের দিকে খেয়াল রাখুন। যে সব রঙয়ের তাপ শোষন ক্ষমতা বেশি সেসব রঙয়ের জামা পরিহার করুন। সাধারণত বাইরে গেলে কালো রঙয়ের জামা পরাবেন না।
  • চাইলে সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন। ৬ মাস বয়সী বাচ্চাদের জন্য সানস্ক্রিন রক্ষাকবজের মতো কাজ করে। তবে অবশ্যই শিশুর উপযোগী সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহারের চেষ্টা করবেন।

উপরের নিয়ম গুলো অনুসরণ করে গরমে নবজাতক শিশুকে সুস্থ রাখা সম্ভব।